মার্সেলো: রবার্তো কার্লোসের, ছায়া ছাড়িয়ে স্বমহিমায় ভাস্বর…!

ব্রাজিলের বোতাফোগো সমুদ্র সৈকতে খেলার প্রস্তুতি, নিচ্ছে একঝাঁক তরুণ। এদের মধ্য থেকে একজন, বলে উঠলো, “আমি হবো পেলে”। তার পাশের জন বলে উঠলো, “আমি হবো রিভালদো”। একে একে, গারিঞ্চা, দুংগা, রোনালদো এমনকি বারের নিচে পাওয়া, গেলো গোলকিপার দিদাকেও। একদম পিছন থেকে সবচেয়ে ছোটজন বলে উঠলো, “আমি হবো রবার্তো, কার্লোস”। বেশ ছোট হওয়ায় এই ছেলেটি ভাইদের, সাথে খেলার খুব একটা সুযোগ পায় না। কিন্তু একদিন তাকে সুযোগ দেওয়ার পর তার জাদুতে, সবাই এতটাই মুগ্ধ হয় যে, সবাই তাকে এখন নিজেদের, দলে নিতে চায়। আসলেই মার্সেলো ভিয়েরা দ্য সিলভা এতটাই দুর্দান্ত, খেলোয়াড় ছিলো যে, সে একদিন সত্যি সত্যি ব্রাজিল জাতীয় দলে এবং রিয়াল মাদ্রিদে তার, আইডল রবার্তো কার্লোসের মত লেফট ব্যাক পজিশনেই নিজের, জায়গা পাকাপোক্ত করে নেয়।

রিয়াল মাদ্রিদ খেলোয়াড় হিসেবে মার্সেলোকে, এভাবেই প্রেসের সামনে আনা হয়মার্সেলো তখনো, জানতেন না ১৪ নভেম্বর, ২০০৬ সালের রৌদ্রোজ্বল এক দিনে রিয়াল মাদ্রিদ প্রেসিডেন্ট র‍্যামোন, ক্যালেদরন তাকে পরিচয় করিয়ে দেবেন ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে, সফলতম ক্লাব রিয়াল মাদ্রিদের ফ্যানদের সাথে। ফুটবল খেলোয়াড়দের জন্য রিয়াল মাদ্রিদের মতো, ক্লাবে জায়গা পাওয়া এমনিতেই অনেক, বড় ব্যাপার, কিন্তু মার্সেলোর জন্য এটি ছিলো আরো বিশেষ কিছু। কারণ রিয়াল মাদ্রিদেই খেলতেন তার, আইডল রবার্তো কার্লোস। মার্সেলো যখনই তার বন্ধুদের সাথে, খেলতেন রাস্তায় অথবা পাড়ার মাঠে, তিনি সব সময়েই লেফট ব্যাক পজিশনেই, খেলতে চাইতেন, যেখানে খেলেই রিয়াল মাদ্রিদ এবং ব্রাজিলে ইতিহাস সৃষ্টি, করেছিলেন তার আইডল।

২০০৬-০৭ মৌসুমে রবার্তো কার্লোসকে আরো, এক মৌসুম রিয়ালে রাখার সিদ্ধান্ত হলো। তাই মার্সেলোকে, রিয়াল মাদ্রিদের একাডেমি টিম কাস্তিয়াতে পাঠানোর কথাবার্তা চলছিলো, যাতে তিনি দ্বিতীয় বিভাগে, খেলে ইউরোপের ফুটবলের সাথে নিজেকে মানিয়ে নিতে, পারেন। কিন্তু রিয়ালের তখনকার কোচ ফ্যাবিও ক্যাপেলোর, হস্তক্ষেপে এগুলোর কিছুই হলো না। এর পরিবর্তে তিনি মূল দলের সাথে ট্রেনিং করা শুরু করলেন। সেখানে মার্সেলো তার, আইডল রবার্তো কার্লোসকে খুব কাছ, থেকে দেখার সুযোগ পান। “যদিও আমি বেশি খেলার সুযোগ পাইনি এবং বেশিরভাগ সময়েই আমাকে, প্রধান স্কোয়াডের বাইরেই রাখা হতো, তাও আমি অনেক, কিছু শিখেছি সে সময়ে”- ফ্যাবিও ক্যাপেলো তাকে কীভাবে সাহায্য করেছিলেন, এই প্রশ্নের উত্তরে ইতালিয়ান, এক সাক্ষাৎকারে মার্সেলো এমন

জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে ট্রেনিংয়ে, ডেভিড বেকহামের বাজে ট্যাকলের শিকার হয়ে রবার্তো কার্লোস ইনজুরড হলে মূল স্কোয়াডে, মার্সেলোর জায়গা হয়। কিন্তু ক্পেলো তখন মার্সেলোকে প্রধান, একাদ মার্সেলো একটি ম্যাচে শেষের ৩০ মিনিট খেলার সুযোগ পেয়েছিলেন। একইভাবে, আরো দু’বার তিনি বেঞ্চ থেকে খেলার সু্যোগ পান রবার্তো, কার্লোস ফিরে আসার আগ পর্যন্ত। এরপর গেটাফের সাথে ম্যাচের সময় ইনজুরি থেকে, ফিরে আসেন কার্লোস এবং একই ম্যাচে হিগুয়েনের বদলি হিসেবে, মাঠে নামেন মার্সেলো। এটিই ছিলো মাদ্রিদের জার্সিতে একমাত্র, প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচ, যেখানে এই দুজনকে একই সাথে মাঠে দেখা গেছে। সে বছর লিগের শেষের দিকে, আর মাত্র দুটি ম্যাচে মার্সেলো বদলি হিসেবে নামার, সু্যোগ পেয়েছিলেন, কিন্তু একইসাথে তার আইডলের সাথে নামার সুযোগ আর আসেনি। তুর্কি ক্লাব, ফেনারবাচে যাওয়ার আগে সেই মৌসুমে মার্লোকার সাথে, মাদ্রিদের সাথে শেষ ম্যাচ খেলে ফেলেন রবার্তো কার্লোস। ব্রাজিলের জার্সিতেও একইসাথে খেলার, সুযোগ হয়নি দুজনের। মার্সেলোর অভিষেক হ,ওয়ার এক মাস আগেই ২০০২ সালের বিশ্বকাপজয়ী এই কিংবদন্তী বিদায় জানান জাতীয়, দলকে।

যদিও মার্সেলোকে কেনা হয়েছিলো ব্রাজিলিয়ান বুলেট, মানব রবার্তো কার্লোসের উত্তরসূরি হিসেবে, কিন্তু ২০০৭-০৮ মৌসুমে ক্যাপেলোর বিদায়ের, পর নতুন কোচ ব্রেন্ড সুস্টারের দলে প্রথম মাসে, লেফট ব্যাক হিসবে জায়গা পান সদ্য কেনা দুই ডিফেন্ডার গ্যাব্রিয়েল হেইনজ এবং রয়স্টোন, ড্রেনথ। রবার্তো কার্লোস উচ্চতায় মাত্র ৫ ফুট, ৬ ইঞ্চি হলেও, সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে তার ছায়া ছিলো অনেক বড়। তার জায়গা নেওয়ার সেই অসম্ভব, কাজটাকে সম্ভব করার স্বপ্নই দেখতেন একসময়ে বোতাফোগোর, সমুদ্র সৈকতে খেলা মার্সেলো ভিয়েরা। তবে কার্লোসের উত্তরসূরি, হওয়ার যে একটা চাপ, সেটি নেওয়ার মতো বয়স তখনো হয়নি মার্সেলোর। ফলে প্রথমদিকে খারাপ পারফর্ম, করার দরুন সহ্য করতে হয়েছিলো বার্নাব্যু, দর্শকদের দুয়োধ্বনি।

মার্সেলো অতি সাধারণ কোনো খেলোয়াড়ের, জায়গা পূরণ করতে আসেননি। এসেছিলেন এমন একজনে,র জায়গা নিতে, যাকে সর্বকালের সেরা ডিফেন্ডারদের, তালিকায় রাখা হয়। রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে কার্লোস জিতেছিলেন ৪টি লা লিগা ও ৩টি চ্যাম্পিয়ন্স, লিগ। জিতেছিলেন ব্রাজিলের হয়ে বিশ্বকাপ। ব্যক্তিগতভাবে দু’বার,, বিশ্বের সেরা ডিফেন্ডার হওয়ার পাশাপাশি ২০০২ সালে ব্যালন ডি অরে, হয়েছিলেন দ্বিতীয়। তার ১১ বছরের রিয়াল মাদ্রিদ ক্যারিয়ারে মাত্র ৩ জন ডিফেন্ডার ব্যালন ডি, অর লিস্টে এসেছিলেন। বাকি দুজন হচ্ছেন পাওলো মালদিনি, এবং ফ্যাবিও ক্যানাভারো। ফাচেত্তির পর ফুলব্যাক হিসেবে কার্লোস ছিলেন মাত্র দ্বিতীয়, ব্যাক্তি, যিনি ব্যালন ডি অরে ২য় স্থান অর্জন করেছিলেন।

যদিও ফ্লোরেন্তিনো পেরেজের গ্যালাক্টিকো যুগ, শুরু হওয়ার আগে থেকেই রবার্তো কার্লোস রিয়ালে ছিলেন, কিন্তু তাও তাকে বিবেচনা, করা হতো গ্যালাক্টিকোর তারকা হিসেবেই। তিনি দুর্দান্ত, গতিতে সামনে এগিয়ে যেতেন, বক্সে পাওয়ারফুল ক্রস দিতেন, ছিলো ভালো ট্যাকলিং, এবিলিটি এবং গেম রিড করতেন খুব ভালোভাবে; সবমিলিয়ে, রবার্তো কার্লোস ছিলো একজন পরিপূর্ণ লেফট ব্যাক। তার উপর, তিনি বিখ্যাত ছিলেন তার বুলেট গতির ফ্রি কিকের জন্য। ২৪ ইঞ্চি পুরু থাই দিয়ে তিনি, ঘণ্টায় ১০০ মাইল বেগে ফ্রি কিক মারতেন!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *